শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

সোনারগাঁয়ে সাংবাদিকতার নামে বাণিজ্য?

প্রকাশ:
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...


ফেসবুক পেজ, পরিচয়পত্র আর দু-চারটি পোস্টেই ‘সাংবাদিক’? পেশার আড়ালে তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি, সোনারগাঁয়ে সাংবাদিকতা কি এখন পেশা, নাকি পরিচয়পত্র বিক্রির একটি সুযোগ? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইন, বিভিন্ন ফেসবুক পেজ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বললে এমন প্রশ্নই সামনে আসে।

একটি ফেসবুক আইডি বা পেজ খুলে কয়েকটি সংবাদ প্রকাশ, সঙ্গে একটি ছবি কিংবা ভিডিও, এরপরই নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ‘সাংবাদিক’ পরিচয়। কারও হাতে আবার দেখা যাচ্ছে সাংবাদিক বা প্রেস লেখা পরিচয়পত্র। কিন্তু সেই পরিচয়পত্রের বৈধতা, সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমের অস্তিত্ব কিংবা সেখানে তার প্রকৃত কর্মপরিচয়,

এসব প্রশ্নের উত্তর অনেক ক্ষেত্রেই স্পষ্ট নয়। সাংবাদিকতা নিছক একটি পরিচয়ের নাম নয়। এটি তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনস্বার্থে তা দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশের পেশা। অথচ এই মৌলিক বিষয়গুলো না জেনেই কেউ কেউ সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করছেন,এমন অভিযোগ স্থানীয়ভাবে রয়েছে।

চায়ের দোকানেও সাংবাদিক!

সোনারগাঁয়ের সাংবাদিকতার বর্তমান চিত্র বোঝাতে একটি ঘটনা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়ার সময় কথার প্রসঙ্গে জানা গেল, দোকানের চা বিক্রেতাও সাংবাদিক! কৌতূহল থেকে জানতে চাওয়া হলো,কোন পত্রিকায় কাজ করেন? টেলিভিশনে কোন পদে আছেন? অফিস কোথায়?

জবাবে তিনি একটি পরিচয়পত্র দেখালেন। পরিচয়পত্রে সাংবাদিক পরিচয় থাকলেও প্রশ্ন থেকে গেল, কোন গণমাধ্যম তাকে নিয়োগ দিয়েছে? কী দায়িত্বে তিনি কর্মরত? তার প্রকাশিত সংবাদ কোথায়?

পরিচয়পত্রটি কীভাবে পেয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দাবি করেন, দুই হাজার টাকার বিনিময়ে সেটি নিয়েছেন। তিনি একজনের নামও উল্লেখ করেন। তবে দাবিটির স্বাধীন যাচাই না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।

ঘটনাটি সত্য হলে বিষয়টি শুধু একজনের পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; বরং সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করে।

 ফেসবুকই কি এখন সংবাদমাধ্যম?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিঃসন্দেহে তথ্য প্রকাশ ও সংবাদ প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু একটি ফেসবুক পেজ থাকা আর একটি প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা এক বিষয় নয়।

কোনো ঘটনার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা নাগরিক সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে। কিন্তু সেটিকে পেশাদার সাংবাদিকতার সমতুল্য দাবি করতে হলে প্রয়োজন দায়িত্বশীল সংবাদচর্চা, তথ্য যাচাই, উৎসের নির্ভরযোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রকাশের মতো মৌলিক নীতি।

সোনারগাঁয়ে একাধিক ফেসবুক পেজ ও ব্যক্তিগত আইডিতে নিয়মিত সংবাদ প্রকাশ হতে দেখা যায়। তাদের কেউ কেউ নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয়ও দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাদের নিয়োগ দিয়েছে কে? তাদের সম্পাদনা কাঠামো কী? প্রকাশিত সংবাদের দায় নেবে কে?

 ‘প্রেস ক্লাব’ নামের ছড়াছড়ি

সাংবাদিকতার সঙ্গে সঙ্গে সোনারগাঁয়ে বিভিন্ন নামে প্রেস ক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠন থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।

একটি সাংবাদিক সংগঠন থাকা কোনো সমস্যা নয়। বরং পেশাগত উন্নয়ন, সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষা এবং নৈতিক সংবাদচর্চায় সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে।

কিন্তু সংগঠন গঠনের ক্ষেত্রে যদি স্বচ্ছতা, গঠনতন্ত্র, সদস্যপদের নিয়ম, নিয়মিত সভা এবং পেশাগত কার্যক্রমের পরিবর্তে শুধু পদ-পদবি ও পরিচয়পত্রই মুখ্য হয়ে ওঠে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, সংগঠনটি আসলে কার স্বার্থে?

একটি ব্যানার, একটি ফেসবুক পেজ আর কয়েকটি পদবি দিয়ে সাংবাদিক সংগঠনের কাঠামো তৈরি করা গেলেও সাংবাদিকতার মান তৈরি করা যায় না।

 সাংবাদিক নাকি পরিচয়পত্রধারী?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি এখানেই। সাংবাদিকতার পরিচয় কি একটি কার্ডে সীমাবদ্ধ? একজন প্রকৃত সংবাদকর্মীর কাজ শুধু পরিচয় দেওয়া নয়। তাকে প্রতিদিন তথ্য সংগ্রহ করতে হয়, তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে হয়, প্রয়োজনে একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলতে হয় এবং সংবাদে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়।

অন্যদিকে পরিচয়পত্র দেখিয়ে যদি কেউ নিজের প্রভাব বিস্তার করেন, ব্যক্তিগত সুবিধা নেন কিংবা কারও ওপর চাপ সৃষ্টি করেন—তাহলে সেটি সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আর যদি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অর্থ আদায় বা চাঁদাবাজির মতো কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, সেটি সাংবাদিকতা নয়; সেটি আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধের বিষয়। এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করা এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি।

বাণিজ্য হলে ক্ষতি কার?

সাংবাদিকতার নামে অনিয়ম বা পরিচয়ের অপব্যবহারের অভিযোগ সত্য হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সৎ ও পেশাদার সাংবাদিকরা।

কারণ একজন সংবাদকর্মী যখন মাঠে তথ্য সংগ্রহ করতে যান, তখন মানুষের কাছে তার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সাংবাদিকতার প্রতি আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

একজনের কর্মকাণ্ডের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের নয়। কিন্তু কয়েকজনের অপেশাদার আচরণ পুরো পেশার ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই প্রয়োজন সাংবাদিকতার পরিচয়কে সহজলভ্য করার বদলে পেশাটিকে আরও দায়িত্বশীল করা।

 প্রয়োজন পরিচয়ের নয়, জবাবদিহির

সোনারগাঁয়ে কে সাংবাদিক, কে রিপোর্টার, এ নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সংবাদমাধ্যমগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। কোন গণমাধ্যমের কতজন প্রতিনিধি রয়েছে, তাদের দায়িত্ব কী, পরিচয়পত্র কে দিয়েছে,এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা থাকলে ভুয়া পরিচয়ের সুযোগ কমে।

একই সঙ্গে সাংবাদিকদেরও নিজেদের পেশাগত মান, নৈতিকতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

কারণ সাংবাদিকতা কোনো ক্ষমতার পরিচয় নয়, এটি জবাবদিহির পেশা।

একটি ক্যামেরা, একটি মাইক্রোফোন, একটি ফেসবুক পেজ কিংবা একটি পরিচয়পত্র কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবাদিক বানায় না। সাংবাদিকতার মূল পরিচয় তৈরি হয় কাজ দিয়ে,তথ্যের প্রতি সততা, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সত্য যাচাইয়ের মাধ্যমে।

সোনারগাঁয়ে তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন আরেকটি নতুন ‘প্রেস ক্লাব’ নয়; বরং প্রয়োজন সাংবাদিকতার নামে কী হচ্ছে, কে কী পরিচয়ে কাজ করছেন এবং সেই পরিচয়ের পেছনে কতটা পেশাগত দায়িত্বশীলতা রয়েছে,তার স্বচ্ছ চর্চা।

প্রশ্নটি তাই থেকেই যায়, সাংবাদিকতার পরিচয় কি সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব, নাকি কোথাও কোথাও তা হয়ে উঠছে বাণিজ্যের নতুন মাধ্যম?

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন