সজিব হোসেন | সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ
২১শে ফেব্রুয়ারি। প্রভাতফেরির গান, শহিদ মিনারের পুষ্পস্তবক আর রঙিন আলপনায় সেজেছে দেশ। কিন্তু রাজধানী থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে সোনারগাঁর গোবিন্দপুর গ্রামের এক নিভৃত কবরস্থানে শায়িত আছেন এমন এক মানুষ, যাঁর হাত ধরেই একদিন দানা বেঁধেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন। তিনি ড. নূরুল হক ভূঁইয়া—ইতিহাসের এক বিস্মৃত নায়ক।
১৯৪৭ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছিল, তখন মুষ্টিমেয় যে কজন নির্ভীক মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিলেন, তাঁদের অগ্রভাগে ছিলেন ড. নূরুল হক ভূঁইয়া। তমুদ্দুন মজলিসের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে তিনি কেবল তত্ত্বকথা বলেননি, বরং মাঠপর্যায়ে সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি ছিলেন 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'-এর প্রথম আহ্বায়ক। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, আন্দোলনের সেই সূচনালগ্নের সারথি আজও রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান ‘একুশে পদক’ পাননি।
তিনি শুধু রাজপথের লড়াকু সৈনিক ছিলেন না, ছিলেন মেধাবী এক বিজ্ঞানীও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের এই অধ্যাপক আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন পাটের অগ্নিরোধক মিশ্রণ এবং বিমানের ইঞ্জিনে ব্যবহৃত ‘সলিড লুব্রিকেন্ট’ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। দেশের বিজ্ঞানচর্চায় তাঁর এই অনন্য অবদানও আজ প্রচারের আড়ালে।
সোনারগাঁর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারি ঘটা করে পালন করা হলেও, স্থানীয় প্রশাসন বা জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে ড. নূরুল হকের সমাধিতে একগুচ্ছ ফুল দেওয়ার সৌজন্যটুকুও দেখানো হয় না। এলাকাবাসীর অভিযোগ,তাঁর নামে কোনো তোরণ বা সড়কের নামকরণ হয়নি। তাঁর পৈত্রিক ভিটায় কোনো পাঠাগার বা জাদুঘর নির্মাণের উদ্যোগ নেই।
নতুন প্রজন্মের সিংহভাগ শিক্ষার্থীই জানে না তাদের ঘরের কোণেই ঘুমিয়ে আছেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম স্থপতি। কেবল সোনারগাঁও সাহিত্য নিকেতন তাদের সীমিত সামর্থ্যে তাঁকে জীবদ্দশায় স্বর্ণপদক দিয়েছিল। এর বাইরে বড় কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি মেলেনি এই কালজয়ী ব্যক্তিত্বের।
১৯৯৮ সালের ২ এপ্রিল ড. নূরুল হক ভূঁইয়া পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ ও আন্দোলনের ফসল আজ সারা বিশ্বের ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। এই বীরকে প্রাপ্য সম্মান না দেওয়া কি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা নয়?
সোনারগাঁর এই কৃতি সন্তানের স্মৃতি রক্ষায় এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। অন্যথায় ইতিহাসের পাতা থেকে এক মহানায়কের নাম মুছে যাওয়ার দায়ভার আমাদের উত্তরসূরিদের নিতে হবে।

