শিরোনাম ::
শিরোনাম ::

৩ দশকের ঐতিহ্য তাহেরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে নজিরবিহীন ফল বিপর্যয়

প্রকাশঃ
প্রসেসিং হচ্ছে, দয়া করে অপেক্ষা করুন...
তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়

সোনারগাঁয়ের তাহেরপুর এলাকায় একসময় সকালের রোদ উঠলেই একটা আলাদা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যেত। ১৯৮৭ সালে যখন 'তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়' প্রতিষ্ঠা করা হয়, তখন এলাকার মানুষ ভেবেছিল ঘরের কাছেই সন্তানরা আলো পাবে। দীর্ঘ ৩৯টি বছর ধরে সেই স্বপ্ন আর সম্মানের ওপর ভর করেই টিকে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু সেই উজ্জ্বল আলো যে ভেতরে ভেতরে এত ফিকে হয়ে আসছিল, তা কে জানত!
চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল যখন সামনে এলো, তখন যেন পুরো তাহেরপুর গ্রামে একটা বড় ধাক্কা লাগল। এমন নজিরবিহীন ফলাফল বিপর্যয় এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন দেখেনি। কিন্তু একটু গভীরভাবে খোঁজ নিলে জানা যায়, এই বিপর্যয় কিন্তু একদিনে আসেনি—এটি বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা ক্ষোভ, অনিয়ম আর চরম অব্যবস্থাপনারই এক চূড়ান্ত রূপ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকদের সাথে কথা বলে যেন এক করুণ গল্পের অধ্যায় উন্মোচিত হলো। অভিযোগের আঙুল মূলতঃ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসনিক কাঠামোর দিকে। বিগত সরকার আমলে দীর্ঘদিন ধরে একই পর্ষদ বিদ্যালয়টি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। অবাক করা বিষয় হলো, পাঁচ সদস্যের সেই কমিটির চারজনই ছিলেন নিরক্ষর! শিক্ষাগত যোগ্যতার আলো না থাকা ব্যক্তিরা যখন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্বে বসেন, তখন শিক্ষার মান কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকতে পারে, তাহেরপুর উচ্চ বিদ্যালয় এখন তারই এক নির্মম উদাহরণ।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান আহাদের বিরুদ্ধে রয়েছে দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ। তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পর্ষদের সহায়তায় তিনি একা হাতেই সব নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ প্রবীণদের। এর ফলে সহকারী শিক্ষকদের কোণঠাসা হতে হয়েছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষকদের মধ্যে হারিয়ে যায় পাঠদানের সেই আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সমন্বয়।
এখানেই শেষ নয়, বিদ্যাপীঠটির চার দেয়ালে একে একে হানা দিয়েছে নানা বিতর্ক—নৈশপ্রহরী নিয়োগে ঘুষের লেনদেন, ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে মাদকের উপস্থিতি, শিক্ষকের হাতে ছাত্রী হেনস্তার চেষ্টা, আর বাইরে বখাটে ও নামধারী রাজনৈতিক নেতাদের দাপট। এসবের মাঝেই ধীরে ধীরে ধসে পড়ে বিদ্যালয়টির পড়াশোনার পরিবেশ।
২০২৬ সালের ফলাফলের এই চরম ধসে অভিভাবক ও স্থানীয় সুশীল সমাজের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ। আর এই দৃশ্য দেখে আগামী ২০২৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের চোখেমুখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা ও চরম হতাশার ছাপ।
অবশ্য এই অন্ধকার কাটিয়ে ফের আলোয় ফেরার এক ক্ষীণ আশাও তৈরি হয়েছে। নতুন অনুমোদিত পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রকিবুল হাসান দায়িত্ব নিয়ে নিজের আক্ষেপের কথা জানান। তিনি বলেন, “এই বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা সদস্যরা ছিলেন আমারই পরিবারের লোক। উচ্চশিক্ষা আর কাজের ব্যস্ততায় বহুদিন এখানে নজর দিতে পারিনি। নিরক্ষর ব্যক্তিদের পর্ষদে রাখা এবং প্রধান শিক্ষকের সাথে শিক্ষকদের এই দূরত্বই প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধ্বংস করেছে। আমি দায়িত্ব পেয়েছি, এখন যেকোনো মূল্যে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে কাজ করব।”
তবে নিজের ঘাড়ে থাকা অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক নুরুজ্জামান আহাদ উল্টো পরীক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, “সাবেক পর্ষদ যেভাবে চালাতে চেয়েছে, আমাদের সেভাবেই চলতে হয়েছে। আমাদের শিক্ষকদের পাঠদানে কোনো খামতি ছিল না। সত্যি বলতে, ২০২৬ সালের ব্যাচের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতিই কিছুটা দুর্বল ছিল, তাই ফল আশানুরূপ হয়নি। আগামীতে পরিস্থিতি নিশ্চয়ই ভালো হবে।”
পুরো বিষয়টি চোখ এড়িয়ে যায়নি উপজেলা প্রশাসনেরও। সোনারগাঁ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সাইদুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, “তাহেরপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ও পরিবেশ এখন আর সন্তোষজনক অবস্থায় নেই। সম্প্রতি নতুন কমিটি অনুমোদিত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন বিপর্যয় আর না ঘটে, সে জন্য শিক্ষকদের কর্মকাণ্ড নিবিড় তদারকির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
যে বিদ্যাপীঠ একসময় সোনারগাঁয়ের বুকে গর্বের প্রতীক ছিল, আজ তা অনিয়মের জালে জড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের লড়াই করছে। নতুন পরিচালনা পর্ষদ আর তদারকির প্রতিশ্রুতি কি পারবে তারিপুর হাজী লাল মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই পুরনো গৌরব ফিরিয়ে দিতে? উত্তরটা তুলে রাখা রইল সময়ের হাতেই।


শিরোনাম...

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%

একটি মন্তব্য করুন

মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন